Ticker

6/recent/ticker-posts

স্বপ্নের রেল যাবে কক্সবাজার.

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন অবশেষে স্বপ্নের রেল যাবে কক্সবাজার। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পথে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে রেলযোগে পর্যটকরা দেখতে যেতে পারবেন বিশ্বের দীর্ঘতম ও সমুদ্রকন্যা নামে খ্যাত দেশের অন্যতম বিনোদন স্থান কক্সবাজার। নয়াভিরাম দৃশ্য, সাগরের গর্জন এবং সূর্যাস্ত দেখতে প্রতি বছর শীত মৌসুম এলেই দেশি-বিদেশি পর্যটকে ভরা থাকে এই স্থানটি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে নাম থাকলেও এই পর্যটন এলাকায় নেই রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা। দেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে রেল সংযোগ। অবশেষে কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ এবার বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন বর্তমানে পুরোপুরি দৃশ্যমান। মাস খানেক আগে প্রবল পাহাড়ি ঢল সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার বড় অংশে আঘাত হানে। সবার মনে শঙ্কা ছিল রেল চালু বুঝি আবারও মুখ থুবড়ে পড়ে। রেললাইনের কয়েক কিলোমিটার এলাকার ক্ষতি হলেও তা এরই মধ্যে সারিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন চলছে ট্রলিতে করে পর্যবেক্ষণ। এরই মধ্যে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। কথা রয়েছে ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী এ রেললাইনের উদ্বোধন করবেন। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ‘আগামী ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ রেললাইন উদ্বোধনের কথা রয়েছে। এ তারিখকে সামনে রেখে কয়েকবার পরীক্ষামূলক ট্রেন চালিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কী না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। কক্সবাজারে নির্মাণাধীন আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের কাজও অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে। স্টেশন ও সড়কের কাজ যেগুলো বাকি আছে সেগুলোর কাজও শেষের পথে।’ গত ২৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প সারা দেশের মানুষের স্বপ্নের প্রকল্প।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে স্বপ্নের এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। চট্টগ্রামের দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ আগে থেকেই ছিল। কালুরঘাট সেতু দিয়ে রেল চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী যেত। তবে দোহাজারী পর্যন্ত রেলযাত্রায় মানুষের আগ্রহ ছিল না বললে চলে। বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইনটি কার্যত অকেজো পড়ে থাকত। দেশের মানুষ সবসময় চেয়েছিলেন ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হোক। চট্টগ্রামের মানুষও দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে রেলে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠছিল না। ট্রান্স এশিয়ান রেল যোগাযোগ নিয়ে অনেক আগে থেকে কথা চলছিল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আসে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ না হলে ট্রান্স এশিয়ান রেল যোগাযোগ হয়ে উঠবে না। সর্বশেষ ২০১০ সালে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রকল্পে সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু ট্রান্স এশীয় রেলপথের সঙ্গে সংযুক্ত হতে ব্রডগেজ রেলপথ লাগবে। তাই প্রকল্প সংশোধন করা হয় ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল। এটি পরিকল্পনা কমিশনে পাস করা হয়। সেই মতে শুরু হয় কাজ। জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। সমীক্ষা অনুযায়ী চট্টগ্রামে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে গুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত আরো ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ রেলপথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেন চলতে পারবে। সূত্র মতে, শুরুতে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। পরবর্তী সময়ে নকশায় পরিবর্তন এনে বাস্তবায়নের নতুন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরুর পর এই মেগা প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সাল পর্যন্ত গড়ায়। প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে তৈরি হয় ঝিনুকের আদলে দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন। এডিবি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ব্যয় দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কক্সবাজার রেললাইন সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল কালুরঘাট সেতু নিয়ে। এ সেতুটির বয়স ১০০ বছরের কাছাকাছি। ১৯৩০ সালে নির্মিত এ সেতুটি কতটুকু ভারবহন করতে পারে এ নিয়ে নানা মত ছিল। তবে বিশেষজ্ঞ দল এ সেতুর নিচের দিকে কাঠামো এখনো অনেক মজবুত এবং সহজে ওপরে সংস্কারের মাধ্যমে রেল চলাচল করতে পারবে বলে মত দিলে কাজ শুরু হয়। গত ১ আগস্ট থেকে কালুরঘাট ব্রিজের সংস্কার কাজ শুরু হয়। গত ৭ আগস্ট থেকে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন এবং যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাজ প্রায় শেষের পথে। রেল সূত্র জানায়, এর মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের আওতায় ৩৯টি বড় আকারের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২২৩টি ছোট সেতু ও কালভার্ট, বিভিন্ন শ্রেণির ৯৬টি লেভেলক্রসিং নির্মাণ করা হয়েছে। হাতি চলাচলের জন্য আলাদা করে আন্ডারপাস করা হয়েছে। দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজরা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার রেলস্টেশনও প্রস্তুত করা হয়েছে। যাতে এসব এলাকার যাত্রীরা সহজে উঠাণ্ডনামা করতে পারেন। রেলওয়ে সূত্র জানায়, এই প্রকল্পকে পৃথক দুটি লটে ভাগ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় লট হচ্ছে চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও দেশীয় তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও দেশীয় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড পৃথক দুই লটের কার্যাদেশ পায়। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নানা কারণে প্রায় ১ বছর বেশি লাগে। তারপরও দেশের মানুষের মধ্যে স্বস্তি যে, বহুল আকাঙ্ক্ষিত রেল শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার যাচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ